জুলাই যোদ্ধার তালিকায় রায়হান, থাইল্যান্ডে চিকিৎসায় সরকারের ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ

মাদারীপুর প্রতিনিধি: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আহত হিসেবে ‘জুলাই যোদ্ধা’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন মাদারীপুরের কালকিনির মো. রায়হান। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তিনি জুলাই আন্দোলনে নয়, বরং ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট স্থানীয় দুই পক্ষের সংঘর্ষে বোমা বিস্ফোরণে আহত হন। এ ঘটনায় তাঁর থাইল্যান্ডে চিকিৎসার পেছনে সরকারের প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তিনি নিয়মিত সরকারি ভাতাও পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, পরিবারের দাবি এবং চিকিৎসার নথিতে উঠে আসা তথ্যের মধ্যে অসংগতি দেখা দিয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সংঘর্ষে আহত হওয়ার অভিযোগ
রায়হান মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার চর ঠেঙ্গামারা গ্রামের বাদশা হাওলাদার ও জাহেদা বেগমের ছেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট চর ঠেঙ্গামারা এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে রায়হানের হাতে থাকা একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। প্রতিপক্ষের ছোড়া ইটের আঘাতে বোমাটি বিস্ফোরিত হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহিন বলেন, ওই দিন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। রায়হানের হাতে থাকা বোমা বিস্ফোরিত হয়ে তিনি আহত হন। তাঁর ভাষ্য, ঘটনাটি ছিল স্থানীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে, জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল না।
পৌর এলাকার দক্ষিণ রাজদী গ্রামের জাহাঙ্গীর মোল্লাও দাবি করেন, স্থানীয়দের সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর রায়হানকে জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এলাকার আরও কয়েকজন বাসিন্দা একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
পরিবারের দাবি, ৫ আগস্ট আহত হন রায়হান
অন্যদিকে, রায়হানের পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকের পাড়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় আহত হন তিনি। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে আহত হিসেবে তিনি সরকারি চিকিৎসা-সুবিধা পেয়েছেন।
তবে মাদারীপুর জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী কামরুল হাসান দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেক এলাকায় ছাত্রলীগ ও পুলিশের সঙ্গে এমন কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।চিকিৎসার নথিতে ৮ আগস্ট ভর্তির তথ্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, রায়হান ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর), যা পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত, ভর্তি হন। এ তথ্য সামনে আসার পর তাঁর আহত হওয়ার প্রকৃত তারিখ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।তবে হাসপাতালে ভর্তির তারিখ একাই আহত হওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় বা ঘটনার স্থান নিশ্চিত করে না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ নথি ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই করা প্রয়োজন।
যাচাই কমিটির বক্তব্যজুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি কাজ করে। কমিটিতে জেলা প্রশাসক আহ্বায়ক এবং সিভিল সার্জন সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ছাত্র প্রতিনিধিরাও যুক্ত ছিলেন।
যাচাই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছাত্র প্রতিনিধি হাফেজ হাসিবুল্লাহ বলেন, উপজেলা পর্যায়ে তথ্য যাচাই করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছিল। জেলা পর্যায়ে তাঁরা মূলত ওই তথ্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এনএসআই, ডিজিএফআই ও ডিএসবিসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমেও যাচাই করা হয়েছিল।মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ও সংশ্লিষ্ট যাচাই কমিটির সদস্য সচিব শরীফুল আবেদীন কামাল বলেন, তালিকাটি ঢাকা থেকে অনলাইনে আপলোড করা হয়েছে। তাঁরা স্থানীয় পর্যায় থেকে স্বাক্ষর করেছেন।পরিবারের বক্তব্যে ভিন্নতা
রায়হানের মা জাহেদা বেগম প্রথমে দাবি করেন, তাঁর ছেলে ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকের পাড়ে সংঘর্ষে আহত হন। তবে পরবর্তী কথোপকথনে তিনি ৮ আগস্টের সংঘর্ষের বিষয়টি স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।রায়হানের বাবা বাদশা হাওলাদারও ছেলের ঘটনায় ‘ভুল হয়ে গেছে’ বলে স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তাঁর ছেলে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। তবে কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় রায়হান বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না।থাইল্যান্ডে চিকিৎসায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, রায়হানের থাইল্যান্ডে চিকিৎসার পেছনে সরকারের কমপক্ষে ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তিনি নিয়মিত সরকারি ভাতা পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে চিকিৎসা ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব, অর্থ ছাড়ের নথি এবং ভাতা গ্রহণের তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি দিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর রায়হান এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।এ বিষয়ে কালকিনির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিশোর কুমার দাশ বলেন, তিনি এ উপজেলায় নতুন যোগ দিয়েছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে খোঁজ নিয়ে ঘটনার তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিবেদনের মূল প্রশ্ন: রায়হান প্রকৃতপক্ষে কোথায় ও কখন আহত হয়েছিলেন, কী তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং বিদেশে চিকিৎসার সরকারি ব্যয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া কী ছিল—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।