১২ বছর প্রবাসে, শেষ বয়সে রাস্তার পাশে—সখীপুরে জামাল উদ্দিনের হৃদয়বিদারক মৃত্যু।

সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি: পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জীবনের প্রায় ১২ বছর সৌদি আরবে কাটিয়েছিলেন জামাল উদ্দিন। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠিয়েছেন। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে দেশে ফেরার পর তার ভাগ্যে জোটে চরম অসহায়ত্ব। অসুস্থ শরীর নিয়ে পড়ে থাকতে হয় রাস্তার পাশে। শেষ পর্যন্ত সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেল সোয়া ৩টার দিকে ভাতিজির বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

জামাল উদ্দিন টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বাসিন্দা। দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থাকার পর কয়েক মাস আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফেরেন। কিডনির জটিলতায় তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাও করতে পারতেন না।
রাস্তার পাশে অসুস্থ জামাল
ঘটনাটি ঘটে গত ১ আগস্ট রাতে। অভিযোগ রয়েছে, অসুস্থ জামাল উদ্দিনকে সখীপুরের কালমেঘা এলাকায় রাস্তার পাশে রেখে চলে যান তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা। রাতভর তিনি অসহায় অবস্থায় সেখানে পড়ে ছিলেন।
পরদিন স্থানীয়রা তাকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেন। পরে তার ভাতিজি ইসমত আরা তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের সহায়তায় হাসপাতালে ভর্তি
স্থানীয়দের সহায়তায় গত ৬ আগস্ট জামাল উদ্দিনকে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় সাত দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে তাকে আবার ভাতিজির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানেই সোমবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
স্ত্রীর ভিন্ন দাবি
জামাল উদ্দিনের স্ত্রী রিনা আক্তার দাবি করেছেন, প্রায় আড়াই মাস আগে তিনি জামাল উদ্দিনকে তালাক দিয়েছেন। ফলে তাকে রাস্তার পাশে রেখে যাওয়ার অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও আইনগত বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় কাউকে একতরফাভাবে দায়ী করার আগে পুরো ঘটনার সত্যতা ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।
প্রবাসজীবনের পর এমন পরিণতি
পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য জীবনের দীর্ঘ ১২ বছর বিদেশের মাটিতে কাটানো একজন মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায় এমন করুণ পরিণতিতে শেষ হওয়া নিঃসন্দেহে হৃদয়বিদারক।
তবে এই কঠিন সময়ে জামাল উদ্দিনকে আশ্রয় দিয়েছেন তার ভাতিজি ইসমত আরা। পাশাপাশি স্থানীয়রাও তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করেছেন। অসহায় একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মানবিক উদ্যোগই তার জীবনের শেষ দিনগুলোর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
জামাল উদ্দিনের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়—অসুস্থ ও অসহায় একজন মানুষের শেষ সময়ে তার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কার?
একজন মানুষ জীবনের শেষ সময়ে বড় কোনো সম্পদ চান না; প্রয়োজন হয় একটু যত্ন, একটু সহানুভূতি এবং পাশে থাকার মতো একজন মানুষের।
জামাল উদ্দিন আর নেই। তার চলে যাওয়া হয়তো একটি সংবাদ হিসেবে সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তার জীবনের শেষ অধ্যায় আমাদের পারিবারিক দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে।
জামাল উদ্দিনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে শান্তি দান করুন।