রামপুরার কার্নিশে ঝুলে থাকা সেই জুলাইযোদ্ধা বাঞ্ছারামপুরের আমির এখন গাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

স্টাফ রিপোর্টার মো রোমন হায়দার|ব্রাহ্মণবাড়িয়া।জুলাই আন্দোলনে দুই পায়ে ছয়টি গুলি, ভাতা বন্ধ; সরকারের কাছে অটোরিকশার আবেদন

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার রামপুরার বনশ্রী এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা অবস্থায় পুলিশের গুলিতে আহত হওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তরুণ আমির হোসেন এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। ভাইরাল হওয়া সেই হৃদয়বিদারক ভিডিও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিলেও ঘটনার দুই বছর পর গুলিবিদ্ধ দুই পা নিয়ে গাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সোনারামপুর ইউনিয়নের দুলারামপুর গ্রামের বাসিন্দা, বিল্লাল মিয়ার ১৯ বছর বয়সী ছেলে আমির হোসেন জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার দুই পা এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ভারী কাজ করতে না পারলেও সংসারের তাগিদে অর্ডার পেলে গাছ কাটার মেশিন নিয়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। বৃদ্ধ অটোরিকশাচালক বাবার একার আয়ে ছয় সদস্যের সংসার চালানো সম্ভব না হওয়ায় বাধ্য হয়েই তাকে এই কষ্টের কাজ করতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আমির বলেন,
“আমি এখনো স্বাভাবিক হতে পারিনি। গত কোরবানির ঈদের দিন মাদক ব্যবসায়ীদের মাদক বিক্রির প্রতিবাদ করায় আমার বাবা, বড় ভাই ও আমার ওপর হামলা করা হয়। ভয়ে মামলা করিনি, কারণ হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও এখন আর কেউ তার খোঁজখবর নেয় না। কয়েক মাস ধরে সরকারি ভাতাও বন্ধ রয়েছে। অর্থসংকটের কারণে চিকিৎসার নিয়মিত ফলোআপও করাতে পারছেন না। সরকারের কাছে একটি অটোরিকশা দেওয়ার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, এতে তিনি নিজেই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবেন এবং পরিবারের দায়িত্বও কিছুটা পালন করতে পারবেন।
এ বিষয়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তারিকুল ইসলাম বলেন,
“জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বহু যোদ্ধাকে আমরা সহায়তা করেছি। আমির আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তিনি যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশের অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু আমিরের ভাগ্য বদলায়নি। তার মতো একজন আহত আন্দোলনকারীকে পুনর্বাসনে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় শিক্ষক সেলিম মিয়া বলেন, আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই আমিরকে ভুলতে বসেছেন। অথচ তার মতো তরুণদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল। তাই তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ভাইরাল সেই ঘটনার পটভূমি
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঢাকার রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া এলাকায় প্রাণ বাঁচাতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে ছিলেন আমির হোসেন। সে সময় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে তার দুই পায়ে ছয়টি গুলি লাগে। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশ-বিদেশে আলোচনার জন্ম দেয়।
পরবর্তীতে এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চলতি বছরের জুন মাসে রায় দেন। রায়ে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।