বাঞ্ছারামপুরে ব্যবসায়ীকে ‘জিম্মি করার জন্য,যুবদল নেতার বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগের পর সংবাদ সম্মেলন।
বাঞ্ছারামপুর প্রতিনিধি:মো রোমন হায়দার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে ‘অরণ্য ডিজিটাল এগ্রো অ্যান্ড ডেভেলপার্স লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. জামাল হোসেন মুকুলকে একটি অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে পৌর যুবদলের আহ্বায়ক ঈমান আলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগও করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মকর্তা, স্থানীয় কৃষক দল নেতা এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ব্যবসায়ীকে আটকে রাখার সময়কার নানা ঘটনার বর্ণনা উঠে এসেছে।
‘ছাদের অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয় এমডিকে’
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ঈমান আলী ৮-৯ জন লোক নিয়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। পরে তারা এমডি জামাল হোসেন মুকুলকে জোর করে ভবনের ছাদের একটি ছোট অন্ধকার কক্ষে নিয়ে আটকে রাখেন।
প্রতিষ্ঠানের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের দাবি, ওই সময় জামাল হোসেনের একাধিক মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়, যাতে তিনি বাইরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমরা বাধা দিতে গেলে ঈমান আলী চেয়ার নিয়ে মারতে তেড়ে আসেন এবং ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেন। পরে জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এমডি স্যার চাঁদা দিতে বাধ্য হন।”
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি প্রতিবেদক।
নারী কর্মীদেরও হুমকির অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ মুক্তা আক্তার বলেন, এমডির সঙ্গে কাউকে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছিল না। তিনি ঈমান আলীকে পরিচিতজন হিসেবে চিনতে পেরে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
মুক্তার ভাষ্য, তিনি ঈমান আলীকে ভদ্রভাবে নিচে এসে কথা বলার অনুরোধ করলেও তিনি তা মানেননি। বরং নারী কর্মীদের দিকে চেয়ার নিয়ে তেড়ে আসেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে এমডি নিজেই কোনো ধরনের সংঘাত এড়াতে নারী কর্মীদের নিচে চলে যেতে বলেন বলে জানান মুক্তা।
ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে কৃষক দল নেতা
ঘটনার সময় প্রতিষ্ঠানের এক ম্যানেজারের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যান বাঞ্ছারামপুর পৌর কৃষক দলের আহ্বায়ক কাবিল হোসেন।
তিনি বলেন, “আমার বোন নার্ভাস হয়ে ফোন করলে আমি দ্রুত সেখানে যাই। গিয়ে দেখি এমডি স্যারকে ছাদের ওপর আটকে রাখা হয়েছে। ঈমান আলীকে জিজ্ঞেস করলে সে আমাকে চলে যেতে বলে।”
কাবিল হোসেনের দাবি, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আত্মীয়-স্বজনদের খবর দেওয়া হয়। পরে পৌর বিএনপির সেক্রেটারি সালেহ মুসা ঘটনাস্থলে এসে তাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেন।
‘প্রতারক হলে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করা উচিত’
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, কোনো ব্যবসায়ী প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
তাদের প্রশ্ন, একজন রাজনৈতিক নেতা কীভাবে নিজে আইন হাতে তুলে নিয়ে কোনো ব্যবসায়ীকে আটকে রেখে অর্থ আদায় করতে পারেন?
স্থানীয়দের মতে, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে এটি শুধু রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার নয়, বরং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিষয়ও হতে পারে।
ঈমান আলীর দাবি কী?
অভিযুক্ত ঈমান আলী সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে জামাল হোসেন মুকুলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, জামাল হোসেন সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তবে জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতারণার অভিযোগ এবং তাকে আটকে রেখে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ—দুটি বিষয়ই পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পুলিশের বক্তব্য
বাঞ্ছারামপুর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) আবু সাইদ বলেন, ঈমান আলীর বিরুদ্ধে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে, যার এসডিআর নম্বর ১৪৪২।
তিনি বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে বা চাঁদাবাজি করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ঈমান আলী যে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন, সেটিও পুলিশ তদন্ত করে দেখছে।”
দলীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা
অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মাহমুদ বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। এ নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে আলোচনা চলছে।”
এদিকে ব্যবসায়ীকে আটকে রাখা, নির্যাতন ও চাঁদা দাবির অভিযোগের ঘটনায় বাঞ্ছারামপুরে নানা আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।